অ্যান্ড্রয়েড ফোনের তুলনায় আইফোনের দাম কেন বেশি?
স্মার্টফোন কেনার সময় অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন আসে, একই ধরনের অনেক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আইফোনের দাম কেন অ্যান্ড্রয়েড ফোনের তুলনায় অনেক বেশি? শুধু ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তাই নয়, এর পেছনে রয়েছে প্রযুক্তিগত, ব্যবসায়িক ও বাজারভিত্তিক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট স্ল্যাশগিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে আইফোন এক্স বাজারে আনার পর থেকেই অ্যাপল তাদের প্রিমিয়াম সিরিজের ফোনের মূল্য তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে ধরে রেখেছে। বর্তমানে সর্বাধুনিক আইফোনের উচ্চ সংস্করণের দাম প্রায় ২ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে, বেস মডেলের দাম শুরু হয় প্রায় ৭৯৯ ডলার থেকে এবং তুলনামূলক কম দামের মডেলও ৫৯৯ ডলারের কাছাকাছি।
অন্যদিকে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনের বাজারে বিভিন্ন দামের অসংখ্য বিকল্প রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে স্যামসাংয়ের বাজেট সিরিজের ফোন ২০০ ডলারেরও কম দামে পাওয়া যায়। কম দামের হলেও এসব ফোনে উন্নত ডিসপ্লে, বড় ব্যাটারি ও দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী নানা ফিচার দেওয়া হচ্ছে।
অ্যান্ড্রয়েড ফোন তুলনামূলক সস্তা হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এই বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা। স্যামসাং, শাওমি, রিয়েলমি, মটোরোলা, ওয়ানপ্লাস, গুগল ও নাথিংসহ অনেক নির্মাতা একই ধরনের গ্রাহককে লক্ষ্য করে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে নতুন ডিজাইন, কম দামে উন্নত ফিচার এবং আকর্ষণীয় অফার দিতে তারা নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যায়।
বিশ্বের স্মার্টফোন বাজারেও অ্যান্ড্রয়েডের অবস্থান শক্তিশালী। স্ট্যাটকাউন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম বাজারের ৭০ শতাংশের বেশি অংশ অ্যান্ড্রয়েডের দখলে। ফলে বিভিন্ন দামের ফোন তৈরি করে আরও বেশি গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে নির্মাতারা।
কম দামে ফোন বিক্রি করতে গিয়ে অনেক অ্যান্ড্রয়েড ব্র্যান্ড উৎপাদন ব্যয় কমানোর বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। অনেক বাজেট ফোনে প্লাস্টিকের বডি, সাধারণ মানের ক্যামেরা সেন্সর অথবা সীমিত সফটওয়্যার আপডেট দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক ক্যামেরা থাকলেও সবগুলোর কার্যকারিতা সমান নয়।
অ্যাপলের ব্যবসায়িক মডেল এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটি নিজেই আইফোনের জন্য প্রসেসর, অপারেটিং সিস্টেম এবং বিভিন্ন সফটওয়্যার সেবা তৈরি করে। অন্যদিকে অধিকাংশ অ্যান্ড্রয়েড নির্মাতা প্রসেসরের জন্য কোয়ালকম বা মিডিয়াটেকের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
এ ছাড়া অ্যান্ড্রয়েড একটি উন্মুক্ত বা ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় নির্মাতাদের শুরু থেকে অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করতে হয় না। এতে তাদের উন্নয়ন ব্যয় তুলনামূলক কম থাকে।
অন্যদিকে অ্যাপলকে আইক্লাউড, এয়ারড্রপ, অ্যাপ স্টোরসহ নিজস্ব ইকোসিস্টেমের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। পাশাপাশি আইফোনে সাধারণত দীর্ঘ সময় সফটওয়্যার আপডেট দেওয়া হয়, যা ব্যবহারকারীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো তাদের ব্র্যান্ড মূল্য। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট নাইনটুফাইভম্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি আইফোন ১৪ প্রো ম্যাক্স তৈরিতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের খরচ বিক্রয়মূল্যের তুলনায় অনেক কম। যদিও উৎপাদন ব্যয়ের বাইরে গবেষণা, বিপণন, সফটওয়্যার উন্নয়ন ও অন্যান্য খরচও যুক্ত থাকে, তারপরও অ্যাপল তুলনামূলক বেশি মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া অ্যাপলের ইকোসিস্টেমও অনেক গ্রাহককে একই ব্র্যান্ডে ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে নতুন আইফোন কিনতে তারা তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতেও আগ্রহী থাকেন।
অন্যদিকে স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান একদিকে প্রিমিয়াম ফ্ল্যাগশিপ ফোন তৈরি করলেও, অন্যদিকে বাজেট ও মধ্যম দামের স্মার্টফোনও বাজারে আনে। এতে বিভিন্ন আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হলেও একই সঙ্গে বিভিন্ন দামের বাজারে প্রতিযোগিতাও বজায় রাখতে হয়।
প্রতি / এডি / শাআ









